যুদ্ধের মাঝেই ইরানের ভেতরে একাধিক নিরাপত্তা ফ্রন্ট, বাড়ছে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যেই ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট ও সম্ভাব্য বিক্ষোভের পাশাপাশি পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে সক্রিয় কুর্দি ও বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও তেহরানের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের অভ্যন্তরে ছোট ছোট সশস্ত্র সেল এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সক্রিয় গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। গ্রেপ্তার ও সংঘর্ষের খবর নিয়মিত প্রকাশ করে যুদ্ধকে জাতীয় নিরাপত্তার লড়াই হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে তারা।
সর্বশেষ রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, ‘বিপ্লববিরোধী’ ও ‘রাজতন্ত্রপন্থি’ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত একটি আট সদস্যের নেটওয়ার্কের সদস্যদের আটক করা হয়েছে। ফার্স প্রদেশে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, আটক ব্যক্তিরা জানুয়ারির দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় মলোটভ ককটেল ব্যবহার ও টায়ার জ্বালিয়ে সহিংসতা চালিয়েছিলেন।
রাজতন্ত্রপন্থীদের নিয়েও সতর্ক তেহরান
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে রাজতন্ত্রের অবসান হলেও সাম্প্রতিক বিক্ষোভে আবারও রাজতন্ত্রপন্থি স্লোগান শোনা গেছে। বিশেষ করে সাবেক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভির প্রতি কিছু মানুষের সমর্থন প্রকাশ পেয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে বর্তমানে বড় কোনো সংগঠিত রাজতন্ত্রপন্থি সশস্ত্র বাহিনী সক্রিয় নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিক্ষোভের প্রধান কারণও রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা নয়; বরং অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভই ছিল মূল চালিকাশক্তি।
তারপরও যুদ্ধ শুরুর পর রাজতন্ত্রপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান বাড়িয়েছে ইরান। দেশটির গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের দাবি, ১৮ মার্চ ২৬টি প্রদেশে ১১১টি কথিত ‘রাজতন্ত্রপন্থি সেল’ শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানুয়ারির বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদদপুষ্ট অভ্যুত্থান হিসেবে দেখছে। যদিও জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরতার সমালোচনা করেছে।
পশ্চিম সীমান্তে কুর্দিদের তৎপরতা
ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে বড় অরাষ্ট্রীয় সামরিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি পশ্চিম সীমান্তের কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। ইরাকের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় কয়েকটি কুর্দি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ঘাঁটি গড়ে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।
তেহরান এসব সংগঠনকে সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করে। অতীতে ইরানি বাহিনী ইরাকের ভেতরে তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলাও চালিয়েছে।
চলতি বছরের যুদ্ধ শুরুর পর কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি (পিজেএকে), ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তান (পিডিকেআই) ও কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টিসহ কয়েকটি সংগঠনের প্রায় ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার যোদ্ধা সম্ভাব্য সীমান্ত অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
তবে পর্যাপ্ত অস্ত্র ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা না পাওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর পর সীমান্তবর্তী এলাকায় আইআরজিসির উপস্থিতি আরও বাড়ানো হয়।
দক্ষিণ-পূর্বে বালুচ বিদ্রোহ
পশ্চিম সীমান্তের পাশাপাশি ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলও দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সেখানে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে জইশ আল-আদল অন্যতম।
আগস্টের শেষ দিকে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করে, তারা সংগঠনটির একটি সেল ভেঙে দিয়েছে। অভিযানে একজন নিহত ও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় অস্ত্র, গ্রেনেড লঞ্চার ও বিস্ফোরক উদ্ধারের কথাও জানানো হয়।
তবে এসব অভিযানের পরও বিচ্ছিন্ন হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অতীতে এসব হামলায় পুলিশ ও আইআরজিসির সদস্যদের হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে।
বাইরের সহায়তা নিয়ে শঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, কুর্দি ও বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে বিদেশি সহায়তা দেওয়া হলে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট আরও জটিল হতে পারে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাতাঙ্কার মতে, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি বাইরের সমর্থনের যেকোনো ইঙ্গিতকেই তেহরান অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখবে।
অন্যদিকে কুইন্সি ইনস্টিটিউটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পারসি মনে করেন, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো একা ইরান সরকারের জন্য বড় হুমকি নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে এসব গোষ্ঠী তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তেহরানের ভেতরে চাপ বাড়ানোর কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে ওয়াশিংটনও। জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ দেশটির কর্মকর্তারা ইরানি বিক্ষোভকারীদের প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়েও ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধের মতো চাপ দেশটির ভেতরে নতুন বিক্ষোভ বা অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও দাবি করেছেন, অর্থনৈতিক চাপ ইরানিদের আবার রাস্তায় নামাতে পারে এবং এমন পরিস্থিতিতে আইআরজিসির মধ্যেও বিভাজন দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরানের জন্য যুদ্ধের ময়দান এখন শুধু আকাশপথ বা আন্তর্জাতিক সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। অর্থনৈতিক সংকট, সম্ভাব্য গণবিক্ষোভ এবং সীমান্তবর্তী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা—এই তিন চাপ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে তেহরানকে। ফলে চলমান যুদ্ধের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও ইরানের সামনে তৈরি হয়েছে একাধিক নিরাপত্তা ফ্রন্ট।
ফেসবুকে বাংলা চ্যানেল
হরমুজে মার্কিন চালকবিহীন ডুবোযান আটক, ইরানের দাবি
- ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- বাংলা চ্যানেল ডেস্ক
কিয়েভে ইউক্রেনের দুই গোয়েন্দা সংস্থার সংঘর্ষ, গুলিতে আহত ৩
- ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- বাংলা চ্যানেল ডেস্ক
মার্কিন হামলার জবাব দিল ইরান, বড় সংঘাতের প্রস্তুতির ইঙ্গিত
- ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- বাংলা চ্যানেল ডেস্ক
ইরানে ফের মার্কিন হামলা, শিশুসহ নিহত; পাল্টা হামলায় মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য
- ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
- বাংলা চ্যানেল ডেস্ক
আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
- ৩১ আগস্ট, ২০২৬
- বাংলা চ্যানেল ডেস্ক