চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস সংকট, বিপাকে জনজীবন ও শিল্পকারখানা


hudhudbd.com
বাংলা চ্যানেল ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ আগস্ট, ২০২৬

চট্টগ্রামে ফের তীব্র আকার ধারণ করেছে গ্যাস সংকট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় নগরীর আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কোথাও চুলায় গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম, আবার কোথাও দীর্ঘ সময় গ্যাস মিলছে না।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২১০ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে দৈনিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট, অর্থাৎ চাহিদার মাত্র ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
মহেশখালীর টার্মিনাল ঘিরে সংকট
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা আমদানিকৃত এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের পর তা বিভিন্ন অঞ্চলে বিতরণ করা হয়।
গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। পরে ৬ আগস্ট টার্মিনালটির একটি অংশ সীমিতভাবে চালু হলেও এখনো এটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি।
ফলে জাতীয় পর্যায়ে এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও চট্টগ্রামে তার সুফল পুরোপুরি পৌঁছাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্পখাতে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় বিভিন্ন কারখানার বয়লার, চুল্লি ও ক্যাপটিভ জেনারেটর স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন কমছে এবং কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিফট কমানো বা আংশিক উৎপাদন বন্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শিল্পকারখানায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন সংকট অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিএনজি স্টেশনেও দীর্ঘ লাইন
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অনেক স্টেশন চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে গাড়িচালকদের দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে নগরীর গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যান চলাচলেও বাড়তি ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।
গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমছে
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। চট্টগ্রামের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনের জন্য প্রায় ৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও সম্প্রতি সেখানে ২৮ থেকে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে রাউজানের দুটি ২১০ মেগাওয়াট ইউনিটও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে গ্যাস সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকটও বাড়ছে।
চুলায় আগুন নেই, বাড়ছে বিকল্প জ্বালানির নির্ভরতা
নগরীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় দিনের বড় একটি সময় গ্যাসের চাপ থাকছে না। বিশেষ করে বহুতল ভবন ও গ্যাস লাইনের শেষ প্রান্তের বাসিন্দারা বেশি সমস্যায় পড়ছেন। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার, বৈদ্যুতিক চুলা কিংবা অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থায় রান্নার কাজ চালাচ্ছেন।
একই সময়ে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় নগর ও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের চাপও বাড়ছে। ফলে সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুই ধরনের সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার বর্তমান কাঠামো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মহেশখালীর এক বা দুটি এলএনজি টার্মিনালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তাদের মতে, জাতীয় গ্রিড থেকে চট্টগ্রামের জন্য নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাইপলাইন সক্ষমতা বাড়ানো, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধি এবং এলএনজি আমদানির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, চট্টগ্রামের মতো দেশের প্রধান বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের জ্বালানি ব্যবস্থা যদি সীমিত কয়েকটি সরবরাহ অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে একটি দুর্ঘটনা বা কারিগরি ত্রুটিই পুরো নগরীর জনজীবন ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।

শেয়ার করুন

Facebook Twitter Whatsapp

বিজ্ঞাপন
ফেসবুকে বাংলা চ্যানেল
এ সম্পর্কিত আরও খবর

নিউজ কর্নার